RESIST FASCIST TERROR IN WB BY TMC-MAOIST-POLICE-MEDIA NEXUS

(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Tuesday, February 21, 2017

একুশে ফেব্রুয়াররি দিনটা আজ শোক জয়ী। একটি জাতির এমন এক আবেগমথিত দিন যেখানে রূপকথার রাজকন্যার চোখের জল মুক্তো বিন্দু হয়ে ঝরে। ভাষা শহীদদের স্মৃতিচারণার দিনটির গলায় পরেছে যুদ্ধজয়ের মালা।



স্বপ্নময় চক্রবর্তী

ঢাকার বাংলা আকাদেমির চত্বরে বটগাছের নিচে কয়েকটি বই বিছিয়ে শুরু হয়েছিল একুশের বইমেলায়। আজ সেই বইমেলা অনেক বড় হয়েছে। পরিণত হয়েছে বইয়ের উৎসবে। অন্য কিছুর নয়। সেই বইমেলারই অভিজ্ঞতার আলোয় ভাষা শহীদদের স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক।




একুশে ফেব্রুয়াররি দিনটা আজ শোক জয়ী। একটি জাতির এমন এক আবেগমথিত দিন যেখানে রূপকথার রাজকন্যার চোখের জল মুক্তো বিন্দু হয়ে ঝরে। ভাষা শহীদদের স্মৃতিচারণার দিনটির গলায় পরেছে যুদ্ধজয়ের মালা।

যুগে যুগে পৃথিবীতে অনেক ‘ওরা’ ছিল। যারা কেড়েছে। ওরা আমা‍‌দের গান গাইতে দেয়নি। ওরা আমাদের জমি কেড়েছে, শ্রম কেড়েছে, মুখের ভাষাও কেড়ে নিতে চেয়েছে। করাচিও চেয়েছিল বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে। দিল্লিও কি চায়নি? ভাষা গেলে সংস্কৃতি যায়, সংস্কৃতি গে‍‌লে অস্তিত্ব বিপন্ন হয় এবং তখন শাসন চালানো সহজ হয়। দিল্লি বাংলা ভাষাকে চিবিয়ে খায়নি। লজেন্সের মতো ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে। কিন্তু করাচি চেয়েছিল চিবিয়ে খেতে। সেই ১৯৪৮-এর মার্চ। জিন্না সাহেব ঢাকায় এসে বললেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হোক উর্দু। গুঞ্জন উঠলো নো...নো। ছাত্রদের এই মাথা নাড়ানো পরিব্যাপ্ত হলো। ছোটখাটো বি‍‌ক্ষোভ প্রথমদিকে। ’৫২ সালের জানুয়ারিতে খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রপ্রধান হয়েই আবার ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সেই ফেব্রুয়ারির একুশে ভাষা দাবি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিলো নেওয়া হলো এবং শেখ মুজিবর রহমন উর্দু চাপানোর প্রতিবাদে ৬ই ফেব্রুয়ারি অনশন করলেন, ওঁকে জেলে পোরা হলো। ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মিছিল করলো, গুলি চললো, সালাম বরকত রফিক জব্বার এবং শফিউর রহমান গুলিতে মারা গেলেন। জনতা কিন্তু থামলো না। একজন শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, ন’বছরের বাচ্চা, অহিউল্লা। ওর নাম অগোচরে থেকে গেছে।

ভাষার জন্য শহীদ হয়েছিলেন শিলচরের বাঙালিরাও ১৯৬১ সালের ১৯শে মে এগারো জন বাঙালি মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন। আসামের বাংলা পঠন তুলে দেবার চেষ্টা ছিল। সেটা আটকেছেন ওরা। ১৯শে এপ্রিল আজ যেন ২১শে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে মিশেছে। আমাদের উচিত কমলা ভট্টাচার্য, বীরেন সূত্রধর, সুকুমার পুরকায়স্থ, সুনীল সরকার এরকম এগারোজন ভাষা শহীদদেরও স্মরণ করা।

২১ মান্যতা পেল — কারণ সেই ভাষাদিবস শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে এলো স্বাধীনতা। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লিগ হেরে যায়। ফজলুল হকের নতুন সরকারের চেষ্টায় উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গণ্য হয়। পাকিস্তানের পুরানো পোস্টকার্ডে বাংলা আর উর্দু হরফ ছাপা থাকতো, টাকার গায়েও। ১৯৫৬ সালে আওয়ামি লিগ ওদিকের সরকার করে। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সরকারি ছুটির দিনও ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনও পূর্ব পাকিস্তান। বাংলাদেশ হয়নি।

১৯৫৮ সালে মার্শাল ল জারি হয়। আয়ুব শাহী রাজত্ব। ২১শে ফেব্রুয়ারির ছুটি বাতিল, শহীদ মিনার ধ্বংস। কবিতা লেখা হয় — ‘স্মৃতির মিনার ভে‍‌‍ঙেছো তোমরা আমরা এখনও সাত কোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো/যে ভিত কখনও কোনও রাজন্য পারেনি ভাঙতে.../ আবার আন্দোলন। সংগ্রাম। এবং বিজয়। 

শহীদ মিনারে এখন মানুষের ঢল এই একুশে। আমরা ভাঙা, তুবড়ে যাওয়া বাঙালিরাও এই দিনে ফুল্ল কুসুমিত হই। আমাদের আবেগও মেশে। ১লা মে যেমন আমেরিকার নয়। সারা বিশ্বের শ্রমিকদের। যেখানে শ্রমিকের রক্তপাত থেকে সূচনা হয়েছিল পথরেখা, তেমনি ২১শে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশের নয়। মাতৃভাষাকে ভালোবাসে এমন সবার।

মাতৃভাষাকে সবাই কি ভালোবাসে? কৃত্তিবাস ওঝাকেও কম গঞ্জনা সইতে হয়নি বাংলায় রামায়ণ লিখেছিলেন বলে। কোরানের বঙ্গানুবাদ নিয়েও কম বেগ পেতে হয়নি। আব্দুল হাকিম নামের এক গ্রাম্য কবি লিখেছিলেন —

‘‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। 

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।’’

পুঁজিসমাবৃত্ত ভোগ বিলাসিত উচ্চকাঙ্ক্ষী বাঙালি এবঙ্গে আগামী বাঙালি প্রজন্ম বাংলা ভাষাকে সম্মান করে না। এ নিয়ে খেদ নেই বরং প্রচ্ছন্ন গর্ব। আব্দুল হাকিম তাই এখনও প্রাসঙ্গিক। স্প্যানিশ-পর্তুগিজ ভাষার জঠরে পুরানো আমেরিকার ভাষাগুলো হজম হয়ে গেছে। হিন্দির জঠরে বাংলায় অংশত জীর্ণ। ইংরেজির আক্রমণও আছে। আমাদের প্রতিরোধের প্রতীক একুশে। ২০০০ সাল থেকে জাতিসঙ্ঘ এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছেন। এটা বাংলাদেশের বাঙালিদের জয়। এদিকের বাংলাপ্রেমিক হিসেবে এই বিজয় গর্বে আমরাও কিছুটা ভাগ বসাতে চাই। একুশের রক্তঝরা দিনটা তাই আমাদের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াবার দিন। শহীদ মিনারের উন্নত মিনারের কাছে আমরা বাহ্যত নত হই, আসলে অন্তর্গত চৈতন্য স্পর্ধায় নেয় মাথা তুলবার ঝুঁকি। 

একুশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে একটা আলোড়ন হয়। একুশের ছাড় দে‍‌খিনি জামা কাপড়ে, ফ্রিজ-টিভি-মাইক্রোওভেনে, যেটা এখানে ১৫ই আগস্টের আগে হয়। শপিংমলে রিবেট হয়, স্পেশাল অফার হয়। ২১‍শের স্মরণে বইতে ছাড় হয়। বইমেলা হয় একমাসব্যাপী। পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু, সারা মাস চলে।

বাংলা আকাদেমি চত্বরের মাঝখানে একটা বটগাছ আছে। আগে বটগাছটিকে ঘিরে বইমেলা হতো। ক্রমশ একুশের বইমেলা বেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে উলটোদিকের সুরাবর্দি বাগানেও বইমেলাটা হয়। ওখানে এখনও সুভাষ দত্তর মতো কড়া পরিবেশবাদী কোর্টে মামলা করেনি, তাই ওই গাছ লতা জড়ানো বাগানে বইমেলা চালাতে অসুবিধা হচ্ছে না।

এই বইমেলার সূত্রপাত ১৯৭২ থেকে। 

একুশের ভাষা শহীদদের মনে রেখে, চিত্তরঞ্জন সাহা নামের একজন সামান্য ব্যবসায়ী বটগাছটার নিচে ৩২টা বই বিছিয়ে বিক্রি শুরু করেন ’৭২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি। সব বইগুলোই মুক্তিযুদ্ধ এবং যেসব শরণার্থীরা ভারতে এসেছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ। পরপর চারবছর চালিয়ে যান তিনি। ’৭৭ সালে আরও কয়েকজন জুটে যায়। ’৭৮ সালে বাংলা আকাদেমির প্রধান আশরাফ সিদ্দিকি চিত্তরঞ্জন সাহার এই প্রচেষ্টাটিকে যুক্ত করে বাংলা আকাদেমির সঙ্গে। তারপর থেকেই এই বইমেলা বিকশিত হতে থাকে। এখন এটা একটা পবিত্র উৎসব।

এবছর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। চীন, পয়ের্তোরিকো, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, রাশিয়া থেকে কবি, লেখক এসেছিলেন। উদ্বোধনী মঞ্চে ওরা ছিলেন। জাতীয়সংগীত গেয়ে বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণা করা হলো। শেখ হাসিনাও একটু আধটু লেখেন। উদ্বোধনী মঞ্চে ওঁর বই উদ্বোধন হয়নি। পরে হয়েছে। বইমেলা জুড়ে টিভি কলরব নেই। ক্যুইজ নেই। সিরিয়াল কন্যার অটোগ্রাফ সংগ্রহ নেই, উদাত্ত বাউলের সঙ্গে প্রমত্ত ব্যান্ডের ফিউশনও নেই। সারা মেলায় একটি মাত্র খাবারের দোকান। একটা আনন্দ স্রোতে বইছে সারা মেলায়, তার মধ্যে জরির কুঁচির মতো চিকচিক করছে অশ্রুবারি।


No comments: