RESIST FASCIST TERROR IN WB BY TMC-MAOIST-POLICE-MEDIA NEXUS

(CLICK ON CAPTION/LINK/POSTING BELOW TO ENLARGE & READ)

Thursday, December 3, 2015

যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা - সুজিৎ রায়

‘‘সহিষ্ণুতা আজ বড় অসহায়,


অসহিষ্ণুতায় ভরেছে ধরা।

কে কার বিচার করবে?

সহিষ্ণু হও ধরা।’’

পংক্তিটি মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রতিকতম কবিতা ‘অসহিষ্ণু’-র শেষাংশ। শনিবার রাত্রিতে তাঁর মাথায় এলেও কবিতাটি প্রকাশ্যে আসে ৮ই নভেম্বর রবিবার দুপুরে, বিহার বিধানসভা নির্বাচনে বি জে পি ধরাশয়ী হওয়ার পর। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সময়জ্ঞান সর্বজনবিদিত। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও কম যান না। দেশে নাথুরাম গডসের শিষ্যদের পিঠ চাপড়িয়ে, লন্ডনে মহাত্মার কথা মনে করিয়েছেন সকলকে। হঠাৎ যেন সহিষ্ণুতার বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। কলকাতা থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে লন্ডন, সারা পৃথিবীতে। এই বার্তা ওবামার কাছেও পৌঁছেছে কিনা, কে জানে!

এ যে অন্য কথা মন্থরার মুখে, মোদীর মেন্টর আর এস এস, যাদের জাতীয়তাবাদের মূলকথা হিন্দুত্ব, যার অবস্থান বহুত্ববাদের বিপরীতে। সহিষ্ণুতা নয়, অসহিষ্ণুতাই এই মতবাদের মূল উপজীব্য। হিন্দুত্ব ও কর্পোরেট স্বার্থের মিশেলে তৈরি ব্রান্ড মোদীর চলার পথও আগ্রাসী হওয়াটাই স্বাভাবিক। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ কোন বিপরীত কণ্ঠস্বর শুনতে চায় না। সর্বগ্রাসী হতে চায়। কিন্তু ভারতের মতো বৈচিত্র্যে ভরা দেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ কায়েম করা সহজ কাজ নয়। ভারতীয় সভ্যতার বহুত্ববাদ চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের নানা অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও বহুত্ববাদের শিকড় রয়েছে অনেক গভীরে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অতীতে রাষ্ট্রনায়কদের নানা সমালোচনা থাকলেও ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’, এখনও এটাই ভারতীয় সংবিধানের মূল সুর।

ধর্মীয় বিবাদ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে দেশের রাজনীতিতে। উভয় সংকট মোদীরও। দেশ-বিদেশের বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষা করে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের বিস্তার ঘটবে মোদী জমানায়। এই ছিল গত লোকসভা নির্বাচনে মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরার প্রাক শর্ত। এই আশাতেই ব্রান্ড মোদীকে তুলে ধরতে দেশ-বিদেশের কর্পোরেট হাউস কল্পতরু হয়েছিল। বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশের মানুষের কাছে মোদীর পরিচয় দিতেও কসুর করেনি কর্পোরেট মিডিয়া। অন্যদিকে সংঘ পরিবারের সদস্যরা নিখুঁত পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন গ্রাম-শহর-মহল্লায় ধর্মীয় বিভেদসহ সমাজে জায়মান নানান অসহিষ্ণুতাকে ব্যবহার করে মোদীর জন্য ভোট এনে দিয়েছিল।

মোদী ক্ষমতায় আসার পর উভয়পক্ষের শর্তেই দেশ চলছে। মোদী ‘ওভারটাইম’ খাটছেন কর্পোরেটদের ‘আচ্ছে দিন’ আনার জন্য, যার সর্বশেষ নমুনা দেশের ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে বিদেশি পুঁজির সেবায় ১০০ শতাংশ নিবেদন করা। অন্যদিকে সংঘকর্তাদের পরিচালনায় হিন্দু তালিবানদের বল্গাহীন সাম্প্রদায়িক প্রচার চলছে দেশজুড়ে। সংঘাত বাধিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণের কাজ চলছে নয়া উদারবাদের চলার পথকে মসৃণ রাখার জন্য। কর্পোরেট সেবায় মনমোহন সিং সরকারের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে মোদী সরকারের স্থায়িত্ব প্রয়োজন। স্থায়িত্বের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে মানতে রাজি বৃহৎ পুঁজির মালিকেরা। কিন্তু সামাজিক অসন্তোষ বা বিশৃঙ্খলাকে তারা বরদাস্ত করবে না, যদি তা তাদের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতা, হিংসার বাতাবরণ আর যাইহোক অর্থনৈতিক কার্যকলাপের বিকাশ ঘটায় না। দেশের বর্তমান অস্থিরতা তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে না তা অনুভব করছে দেশি-বিদেশি পুঁজির মালিক। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করলে মোদীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হ্রাস পাবে। উলটোদিকে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির তাক্‌ত বাড়লে সংস্কারের নামে পুঁজির শোষণ-লুণ্ঠনের অবাধ গতি রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তো রয়েইছে। তাই বার্তা এসেছে অসহিষ্ণুতার লাগাম পরানোর। প্রথম সতর্কবার্তা আসে মার্কিন রেটিং সংস্থা ‘মুডিজ’ থেকে। এরপর ইনফোসিস কর্তা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় পুঁজির মালিক সকলেই চাইছেন মোদী কট্টর ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নিয়ন্ত্রণ করুন। সেই আশঙ্কা থেকে কর্পোরেট স্বার্থে সংঘকর্তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলতে হবে মোদীকে। ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। তাই দেশে নয় লন্ডনে গিয়ে মনে পড়েছে গান্ধীজীর কথা, সহিষ্ণুতার কথা।

আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও ৮ই নভেম্বর দুপুরে বিহার রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বি জে পি ধরাশয়ী হওয়ার পর টের পেলেন, ‘সহিষ্ণুতা আজ বড় অসহায়।’ গত কয়েকমাস ধরে দেশের রাজনীতি উত্তাল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে, সরকারি প্রশ্রয়ে ধর্মীয় আগ্রাসন কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে, গো-মাংসকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যা সভ্য সমাজের লজ্জা।

বিহার নির্বাচনে পরাজিত বিধ্বস্ত মোদীর উপর চাপ বাড়ানোর কৌশলে তিনি ব্যবহার করলেন ‘অসহিষ্ণুতা’ নামক শব্দবন্ধকে। শোনা যাচ্ছে সারদা কেলেঙ্কারি থেকে সি বি আই-র নজর ঘোরাতে অমিত শাহদের ২৫০ কোটি টাকা নজরানা দিতে হয়েছে মুকুল রায়কে। কখন কি যে হয় কেউ বলতে পারে না। বিহার নির্বাচনের ফলাফল মোদী বিরোধীদের এককাট্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিরোধী জোটে থাকার ছল করে নিজের দাম বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এযেন আঘাতের আগেই প্রত্যাঘাতের জন্য অস্ত্রে শান। ব্ল্যাকমেলিং-এর রাজনীতি যা বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থী দলগুলির রাজনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম একটি উপাদানও।

সহিষ্ণুতার পাঠ দিচ্ছেন কে? মমতা ব্যানার্জি (!)। রাজ্যে তৃণমূল শাসনের সাড়ে চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর সহনশীলতা নামক শব্দটির আর কোনো অর্থই নেই বঙ্গবাসীর কাছে। ক্ষমতায় আসার আগেও মমতা ব্যানার্জির উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা প্রত্যক্ষ করেছে রাজ্যবাসী। কোনো কিছুই বাদ ছিল না তখন। থানায় ঢুকে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে চড় মারা। ওসি-র মুখে আলকাতরা মাখানো, আয়কর অফিসারদের কলার ধরে চড় মারা, চম্পলা সর্দারকে ধর্ষিতা সাজানো, দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফায়দা তুলতে আত্মহত্যার নাটক, বিধায়কদের সঙ্গে নিয়ে বিধানসভায় ভাঙচুর আরও কত কি। 

এ তো গেল মমতা ব্যানার্জিদের কালো অতীত। মিডিয়ার প্রিয় অগ্নিকন্যা ক্ষমতায় আসার পর এখন ‘লেডি হিটলার’। নির্বাচনে জিতে এসে তার সর্বপ্রথম নিদান ছিল বিরোধীদের অন্তত পাঁচবছর চুপ থাকার। এখন সেই সময়সীমা বেড়ে ৩০ বছর হয়েছে। গায়ের জোরে দখল অথবা টাকার জোরে কিনে নেওয়ার কালপর্ব চলছে রাজ্যজুড়ে। সে, পঞ্চায়েতের সদস্যের তৃণমূলকে সমর্থনই হোক বা কোনো ‘বুদ্ধিজীবী’র বুদ্ধিই হোক। এরজন্য চাই টাকা। সরকারি মদতে রাজকোষের লুট চলছে। সিন্ডিকেটরাজ বিস্তার লাভ করেছে সর্বত্র। তোলাবাজির দাপট জনজীবনের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। টাকার লালসা এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত যে, জঙ্গি সংগঠনগুলোও এই সু‍‌যোগে ঘাঁটি গেড়েছে রাজ্যে। তাদের সাহায্য করছে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব ও পুলিশ। রাজ্যের এই পরিস্থিতি শ্রমজীবী জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মেহনতি জনগণকে তার ক্ষুদ্র পরিচিতির গণ্ডিতে আবদ্ধ করছে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এই আবহ রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণি রাজনীতির ধারাকে অন্য খাতে নিয়ে যেতে তৎপর। সমাজে যেটুকু সামাজিক সাম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার অবশিষ্ট আছে, তাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। উৎসাহিত করা হচ্ছে মধ্যযুগীয় অন্ধতাকে, স্বৈরতান্ত্রিক অসহিষ্ণুতাকে। এর প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে এই রাজ্যের ঘটে চলা প্রতিদিনকার ঘটনাবলীতে।

রাজনীতির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। শুধু রাজ্যবাসীর জন্য নয় মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পক্ষেও। একটি মাত্র নির্বাচনের খারাপ ফল তৃণমূল দলকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিতে পারে, আশঙ্কায় তৃণমূল নেত্রী ছাত্রদের নিয়ে কলেজ নির্বাচনও এড়িয়ে যাচ্ছেন। লুম্পেনরাজের উপর নেত্রীর রাশ ক্রমশ আলগা হচ্ছে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা ক্রমবর্ধমান। তৃণমূলের তৈরি ফ্র্যাংকেনস্টাইন তার দলকে গ্রাস করছে খুব শীঘ্রই। এই আশঙ্কা মমতা ব্যানার্জিদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে মোদীর গুজরাট ক্যাডারের সি বি আই অফিসারদের তূণে কি তীর আছে তাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এই নিদারুণ অনিশ্চয়তার আবহে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে মোদীর সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করা ছাড়া আর কিভাবে তিনি ব্যবহার করতে পারেন বিহার নির্বাচনের ফলাফলকে (!)। মোদীকে, ‘দূরে গিয়ে কাছে আসার’ বার্তা দিতে আর নিজের অসহিষ্ণু ভাবমূর্তিতে কি আরও একপ্রস্থ প্রলেপ দিতে চাইছেন মমতা ব্যানার্জি ?

- See more at: http://ganashakti.com/bengali/news_details.php?newsid=75068#sthash.B9weqbQ6.dpuf

No comments: